হার্টের রিং (স্টেন্ট) হচ্ছে এক ধরনের জালিকাযুক্ত ছোট টিউবের মতো বস্তু, যা হার্টের রক্তনালি চিকন বা সরু (ব্লক) হয়ে যাওয়া জায়গায় বসানোর পর ওই রক্তনালিকে প্রসারিত করে রাখে। এটি ধাতব পদার্থ দ্বারা তৈরি। বেশির ভাগ সময় এই ধাতব পদার্থের ওপর একটি ওষুধের প্রলেপ লাগানো থাকে। এটি সাধারণত ৮-৫২ মিলিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এবং ২.২৫-৫.০০ মিলিমিটার পর্যন্ত এর ব্যাস হয়।
রিং সাধারণত তিন ধরনের হয়
♦ মেটাল বা ধাতব পদার্থ দ্বারা তৈরি রিং (কোবাল্ট ক্রোমিয়াম) : এটি এখন প্রায় বিলুপ্ত
♦ ওষুধ লাগানো রিং : এটিই বহুল পরিচিত এবং সারা পৃথিবীতে এটিই বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ধরনের রিংয়ে মেটালের ওপর বিভিন্ন ধরনের ওষুধ লাগানো থাকে (যেমন- ইভারোলিমাস, জোটারোলিমাস ইত্যাদি) যা রক্তনালির গায়ে লেগে থাকা চর্বি অপসারণ করতে সাহায্য করে।
♦ বায়োআবজর্ভেবল রিং : যা ধীরে ধীরে রক্তনালির সঙ্গে মিশে যায়।
যা জানা জরুরি
♦ রোগীর অন্য কোনো রোগ আছে কি না। যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অ্যাজমা, কিডনির সমস্যা, লিভারের সমস্যা ইত্যাদি।
♦ রক্তনালির ব্লকের ধরন যেমন ১০০ শতাংশ ব্লক কি না, কয়টি রক্তনালিতে ব্লক আছে।
কাদের রিং পরানো ঝুঁকিপূর্ণ?
♦ বয়স অনেক বেশি
♦ অন্যান্য রোগে ভুগছেন যেমন-ডায়াবেটিস, কিডনির সমস্যা, লিভারের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ। এ ক্ষেত্রে এই রোগগুলোকে রিং পরানোর আগে এবং পরে নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত।
রিং পরানোর পর যা মেনে চলবেন
♦ নিয়মিতভাবে পর্যাপ্ত হাঁটতে হবে, যা হার্টের ছোট ছোট রক্তনালিকে খুলে দিতে সাহায্য করে।
♦ চর্বিজাতীয় খাদ্য পরিহার করতে হবে। যেমন গরুর মাংস, খাসির মাংস, ডিমের কুসুম, ঘি, মাখন, কেক, পুডিং, অতিরিক্ত তেল। ধূমপান থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকতে হবে।
♦ ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ব্লাড সুগার সকালে খালি পেটে ৬-৮-এর মধ্যে ও ব্লাড প্রেসার ১২০/৮০ মিলিমিটার অব মার্কারি রাখলে ভালো হয়।
♦ রক্ত তরল রাখার ওষুধ যেমন অ্যাসপিরিন, ক্লপিডগরিল, টিকাগ্রেলর ও চর্বি কমিয়ে রাখার ওষুধ যেমন অ্যাট্রোভাসটেটিং ও রসুভাসটেটিং জাতীয় ওষুধ আজীবন খেতে হবে।
♦ অন্যান্য রোগের জন্য নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে।
♦ ৩-৬ মাস পরপর ডাক্তারের পরামর্শের জন্য ফলোআপে থাকতে হবে।
পরামর্শ দিয়েছেন-
ডা. এ কে এস জাহিদ মাহমুদ খান, কনসালট্যান্ট (কার্ডিওলজি), ল্যাবএইড, ধানমণ্ডি, ঢাকা।
জেনে নিন হার্টে রিং পরানোর সুবিধা-
১. রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করা: স্টেন্ট ব্লক হওয়া ধমনীগুলো খুলে দেয়, ফলে হার্টে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায়।
২. হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা: বিশেষ করে যদি এটি জরুরি পরিস্থিতিতে (যেমন অ্যাকিউট হার্ট অ্যাটাক) করা হয়।
৩. বুকে ব্যথা (অ্যাঞ্জাইনা) কমানো: রক্তপ্রবাহ ঠিকমতো হলে বুকে ব্যথার সমস্যা কমে।
৪. জীবনযাত্রার মান উন্নত করা: হাঁটা, শারীরিক পরিশ্রমসহ দৈনন্দিন কাজ করা সহজ হয়।
রিং পরানোর পরও কিছু ঝুঁকি থাকে-
১. স্টেন্ট পুনরায় ব্লক হওয়ার সম্ভাবনা: অনেক ক্ষেত্রে রিং পরানোর পরও ধমনী আবার সংকুচিত হতে পারে।
২. রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি: রিং-এর চারপাশে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে, যা নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে। এজন্য দীর্ঘ সময় ব্লাড থিনার (অ্যান্টি-প্লেটলেট) ওষুধ খেতে হয়।
৩. অন্যান্য ধমনীতে ব্লক হওয়ার সম্ভাবনা: রিং যেখানেই বসানো হোক না কেন, যদি লাইফস্টাইল ঠিক না করা হয়, তবে অন্য ধমনীগুলোও ব্লক হতে পারে।
৪. জীবনব্যাপী ওষুধ সেবনের প্রয়োজন: ব্লাড থিনার, কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।
স্টেন্ট পরানোর পর কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়?
১. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস (কম চর্বিযুক্ত, বেশি শাকসবজি ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার)
২. নিয়মিত ব্যায়াম (চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী)
৩. ধূমপান ও মদ্যপান থেকে বিরত থাকা
৪. নিয়মিত ওষুধ খাওয়া ও ফলো-আপ চেকআপ করা
৫. স্ট্রেস কমানো
হার্টে রিং পরালে তাত্ক্ষণিকভাবে ব্লক খুলে গিয়ে স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহ হয় এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমে। তবে এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। যদি জীবনযাত্রা পরিবর্তন না করা হয়, তাহলে আবার ব্লক হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
Leave a Reply